ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার শুরুর আগে যে ৭টি বিষয় মহা গুরুত্বপূর্ণ…

বর্তমানে প্রযুক্তি সমৃদ্ধ বাংলাদেশে বেশির ভাগ তরুন তরুণী বেকারত্ব ঘুচিয়ে সফল ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ফ্রিল্যান্সিংকেই বেছে নিচ্ছে। দক্ষ, পরিশ্রমী, সৃজনশীল তরুন তরুনি এই বিপুল সম্ভাবনাময়  ফ্রিল্যান্সিং কে তাদের দক্ষতা দিয়ে দিনকে দিন দেশ এবং দেশের বাইরে নিজেদের সফলতার স্বাক্ষর রেখে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যা উদীয়মান তরুন তরুণী দের এই পেশায় আসতে আরও আগ্রহী করে তুলছে। 

আই সি টি বিভাগের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ ফ্রিল্যান্সার বাংলাদেশে রয়েছে যার মধ্যে ৫ লক্ষ ফ্রিল্যান্সার অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা তার বাহিরে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। 

যার ফলশ্রুতিতে আমরা প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার দেশের অর্থনীতিতে যোগ করতে পারছি।

এবার মূল আলোচনায় আসা যাক,

এতো সফলতার মাঝে একটা প্রশ্ন এসেই যায়, এই সাড়ে ৬ লক্ষ ফ্রিল্যান্সার কি তাদের উপার্জন দিয়ে নিজের এবং পরিবারে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে?

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এতো বড় একটি ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটিতে মাত্র কয়েক হাজার সফল ফ্রিল্যান্সারই নিজেদের লক্ষ্য শতভাগ পুরন করতে সক্ষম হচ্ছে। বাকিরা হারিয়ে যাচ্ছে অথবা নাম মাত্র উপার্জন করে ফ্রিল্যান্সিং এর এই অসীম প্রতিযোগিতায় প্রতিদিন নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যা আমরা মাসের পর মাস রাত জেগে অপেক্ষা করে ৫ ডলারের উপার্জন করা একজন নতুন ফ্রিল্যান্স যোদ্ধার  বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং গ্রুপ গুলোতে যুদ্ধ জয়ের পোস্ট থেকে সহজেই অনুমান করতে পারি। 

ফ্রিল্যান্সিংয়ে ক্যারিয়ার গড়া কেন এতো কঠিন হচ্ছে, কেন কাজ পাচ্ছি না, কেন সফল ফ্রিল্যান্সার এতো কম, নাকি  ফ্রিল্যান্সারের তুলনায় মার্কেটের কাজ কম, নাকি অভিজ্ঞরা পুরো মার্কেট দখল করে ফেলেছে? সমস্যা টা আসলে কোথায়?

  • একটা ছোট্ট উদাহরন দিলে হয়ত সমস্যাটা কিছুটা হলে ও বোঝা যেতে পারে তারপর সমাধান টা ও দিয়ে দিব। 🙂 

ধরুন একটা শিক্ষার্থী মাধ্যমিকে সাইয়ন্স নিয়ে পড়া শুরু করলো, কারন তার বাবা একজন ডাক্তার আর পরিবার এবং আত্মীয় স্বজন ও তাকে বলল ডাক্তারি পেশায় অনেক সুন্দর এবং নিশ্চিত এবং সমৃদ্ধ একটি ভবিষ্যৎ আছে। সবার কথা শুনে শিক্ষার্থীটি মনঃস্থির করলো সে সাইন্স পড়ে ডাক্তার হবে। আর কিছু দিনপর সে সাইন্স এ সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে মাধ্যমিক পাস করলো।

“এখন যদি তাকে যেকোনো হাসপাতালে প্র্যাকটিস করার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয় বা যে যদি নিজের চেম্বার খুলে রোগীর চিকিৎসা দেয়া শুরু করে তখন কেমন হবে? সে কি চিকিৎসা করার জন্য কোন রোগী পাবে বা কোন রোগী তার সাথে কথা বলে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হবে??? “

উত্তর টা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। আর ফ্রিলান্সিংয়ে সফল ফ্রিলান্সারের সংখা এত কম হওয়ার পিছনের কারনটাও অনেক টা এরকমই।

  • তাহলে নতুনরা কিভাবে ফ্রিলান্সিং শুরু করলে সফল হওয়ার সম্ভবনা বাড়বে? নিচের ৭টি কারন আপনার সেই প্রশ্নের উত্তর টাই দিবে,

১. আপনি কেন ফ্রিল্যান্সার হিসাবে ক্যারিয়ার গড়তে চানঃ 

ফ্রিল্যান্স ক্যারিয়ার শুরু করার আগে প্রতেকের নিজেকে অবশ্যই এই প্রশ্ন টা করা উচিত। প্রত্যেকটা মানুষের যেকোনো কিছু করার পিছনে এক বা একাধিক কারন বা অনুপেরনা থাকতে পারে। তবে বেশিরভাগ সময় আমারা সেই কারন টা খুঁজে বেড় করতে পারি না। 

যার ফলে বেশির ভাগ মানুষের ক্যারিয়ার শুরু হয় মানুষের সফলতা, অতিরিক্ত উপার্জনের লোভ, সহজে ধনী হওয়ার কাল্পনিক ইচ্ছা নিয়ে। যা তাকে গন্তব্য হীন অনিশ্চিত একটি রাস্তায় নিয়ে যায়, যার শেষ হয় চরম ব্যর্থতায়।

তাই অন্যের ডলারের স্ক্রিনশর্ট, আর আকাশ কুসুম গল্প শুনে ফ্রিল্যান্স ক্যারিয়ার শুরু করা ইচ্ছা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। সফল ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ফ্রিল্যান্সিং ই একমাত্র পথ না। তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর পেলেই কেবল সামনে আগান। 

“সফলতা শুধু সফলদের জন্য না যুগ যুগ ধরে ব্যর্থরাই সফল হয়েছে”

২. কি নিয়ে কাজ করবেন এবং কেন করবেনঃ

ফ্রিল্যান্সিং বা যেকোনো সেক্টরে সফল হওয়ার জন্য সেই সেক্টরের যেকোনো বিষয়ে চূড়ান্ত লেভেলের দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। 

“অনেক সফল ফ্রিল্যান্সার ই মনে করেন ফ্রিল্যান্সিংই একমাত্র পেশা যেখানে একটি বিষয়ে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি সমসাময়িক একাধিক বিষয়ে ধারনা রাখা বর্তমান সময়ে মাস্ক পরার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়”

মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যতে আপনার ক্যারিয়ার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা আপনার এই গুরুত্বপূর্ণ সিধান্তের অপরই নির্ভর করবে। 

আপনি চাইলেই আর্টিকেল রাইটার, এনিমেটর, ওয়েব ডেভলাপার বা গ্রাফিক ডিজাইনার বা অন্য যেকোন স্কিলে স্কীলড হতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই সে স্কিলে মার্কেটে কাজের পরিমান এবং কম্পিটিশন সম্পর্কে আপনার বিস্তারিত ধারনা থাকা খুবই জরুরি।

আবার এমন ও হতে পারে, যে কাজের পরিমান মার্কেটে তুলনামুলক বেশি এবং কম্পিটিশন কম সে স্কিল নিয়ে আগানো শুরু করলেন এবং মাঝ পথে গিয়ে মনে হল। কাজটা আপনি মোটেও এঞ্জয় করছেন না। অন্য কিছু শিখতে মন চাচ্ছে। এই সকল বিষয় সফল এবং দক্ষ হওয়ার অন্তরায়।

তাই সিধান্ত নেয়ার আগে ইউটিউব, গুগল আর সিনিয়রদের সাজেশন আর আপনার রিসার্চ ই আপনাকে সঠিক সিধান্ত নিতে সহযোগিতা করতে পারে। আমার মতে এর কোন বিকল্প নেই। 

“মনে রাখতে হবে সফল ফ্রিল্যান্সাররা হুজুকে বাঙ্গালি হয় না”

৩. বিস্তারিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা: 

যে ফ্রিল্যান্সার যত বেশি সুশৃঙ্খল এবং পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে বদ্ধপরিকর সেই ফ্রিল্যান্সারদের সফলতার হার তত বেশি। যা আমরা সফল ফ্রিল্যান্সারদের ব্যক্তি এবং প্রফেশনাল জীবন পর্যালোচনা করলেই বুঝতে পারি। 

তাই যে বিষয়েই দক্ষতা অর্জন করিনা কেন সে দক্ষতা কিভাবে এবং কোথায় কাজে লাগাবো সে পূর্ণ ধারনা থাকা খুবই প্রয়োজন। কারণ পরিকল্পনাহীন মানুষ মাঝি বিহীন নৌকার মতই গন্তব্য শূন্য।

৪. বিকল্প ব্যবসায়িক পরিকল্পনা (প্লান B):

যেমন টা শুরুতে বলেছিলাম, ফ্রিলান্সিংএ নিশ্চিত ভবিষ্যৎতের জন্য একাধিক বিষয়ে দক্ষ হওয়া জরুরী। কারন বছরের প্রতিটি মাসে একই ধরনের কাজ সব সময় পাওয়া যায় না ঠিক তেমনি ক্লায়েন্টের ও এক ধরনের কাজ সারা বছর প্রয়োজন হয় না। তাই ব্যাকআপ স্কিল থাকলে  বছরের প্রতিটি মাসেই না কিছু না কিছু উপার্জন করতে পারবেন। যখন দক্ষ হয়ে যাবেন তখন ধীরে ধীরে প্যাসিভ ইনকামের দিকে আগাতে পারেন। 

৫. কিভাবে এবং কোথায় ক্লায়েন্ট পাবেনঃ

নতুন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য  ক্লায়েন্ট একটা আতংকের নাম। অনেকই বলেন  ফ্রিলান্সিং স্বাধীন কাজ এবং সহজ কাজ, কম্পিউটারে বসলেই হাজার হাজার ডলার ইনকাম করা যায়। কিন্তু একজন নতুন ফ্রিল্যান্সারই জানেন কতটা নদী কতটা সাগর অতিক্রম করে সে একজন ক্লায়েন্ট নামের সোনার হরিণের দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে সফল ফ্রিল্যান্সারদের ৪০ থেকে ৫০ ভাগই খুব দুরুতই এই সোনার হরিণের দেখা পেয়ে যায়। আর ব্যর্থ  ফ্রিল্যান্সারদের ৫ ভাগ ভাগ্য বা স্পামিং এর মাধ্যমে ক্লায়েন্টের দেখা পায়, যা কখনই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাদের নিয়ে আলোচনায় না যাই।

এখন কথা হচ্ছে সফল ফ্রিল্যান্সারদের ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কিভাবে ক্লায়েন্ট পেয়ে যায়?

সফল ফ্রিল্যান্সারদের ক্যারিয়ার বিবেচনা করলে খুব সহজেই কিছু বিষয় চোখে পরবে, সে গুলো হলোঃ 

  • ক.  তাদের কমুনিকেটিভ ইংলিশ ভাল  
  • খ. তাদের নিজেদের পোর্টফোলিও ওয়েব সাইড আছে অথবা বিহান্স / ড্রিবল/ ফ্লিকারে পোর্টফোলিও আছে।
  • গ. অনলাইন মার্কেটে তাদের প্রোফাইল আকর্ষণীয় এবং তথ্য বহুল।
  • ঘ. তারা গতানুগতিক বিষয় নিয়ে কাজ করার চেয়ে প্রতিযোগিতা কম কিন্তু ক্লায়েন্টদের চাহিদা আছে সে বিষয় গুলো নিয়ে কাজ করতে সাচ্ছন্দবোধ করেন। 
  • ঙ. সামাজিক মাধ্যম বিশেষ করে লিঙ্কেডিনে তারা নিয়মিত তাদের কাজ, অর্জন, দক্ষতা বুদ্ধিমত্তা সাথে প্রচার করে থাকেন। 

৬. নিজেকে নিয়ন্ত্রন করা এবং নিয়মানুবর্তী হওয়া:

নিজেই নিজের বস হওয়া যেমন স্বস্তির ঠিক তেমনি এটা চিন্তার বিষয় ও বটে। বেশির ভাগ নতুন ফ্রিল্যান্সারদের এটাই সবচেয়ে বড় বাধা। কারন তারা জানে না কিভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার পাশাপাশি সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হয়। এটা সত্যি একজন ফ্রিল্যান্সার যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় যেকোনো পোশাকে কাজ করতে পারেন।  ঠিক তেমনি ক্লায়েন্ট এর সাথে কমিউনিকেশন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, সেলফ মোটিভেশন, ইনোভেটিভ আইডিয়া, টাইম ম্যানেজমেন্ট, কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, ভ্যাকেশন, ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট মত আরও অনেক বিষয় সময় মত এবং সঠিক ভাবে সম্পন্ন করতে পারার গুন থাকা খুবই জরুরী। অন্যথায় সাজানো সপ্ন ভেঙে যাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার।

৭. সমসাময়িক বিশ্ব এবং অনলাইনের রিসোর্স সম্পর্কে অবগত থাকাঃ

তথ্য এবং রিসোর্স একজন ফ্রিল্যান্সারের মহা মূল্যবান সম্পদ। আপনি যত আপনার কাজ এবং নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য বহুল হবেন, সফলতা তত তারাতারি আপনার কাছে ধরা। প্রথম অবস্থায় তথ্য এবং রিসোর্সের জন্য গুগোল, ইউটিউব, এবং আপনার অনলাইন মার্কেটের ব্লগই যথেষ্ট।

ফ্রিল্যান্স গুরুর এই ৭টি টিপস আশা করি নতুন ফ্রিল্যান্সারদের সফল হতে সহায়ক হবে। এই বিষয়ে ফ্রিল্যান্স গুরুর কাছে যেকোনো প্রশ্ন এবং সাজেশনের জন্য কমেন্ট করুন অথবা ভিজিট করুন আমাদের ওয়েব সাইডে। 

যোগাযোগ করুনঃ

Mobile: 0174 037 0323

Email: Contact@freelanceguru.net

FACEBOOK YOUTUBE

 

 

 

Write your comment Here


The reCAPTCHA verification period has expired. Please reload the page.